Monday, May 23, 2016

নকশি কাঁথার ইতিহাস সর্ম্পকে জানুনঃ

নকশি কাঁথার ইতিহাস সর্ম্পকে জানুনঃ
নকশি কাঁথা হলো সাধারণ কাঁথার উপর নানা ধরণের নকশা করে বানানো বিশেষ প্রকারের কাঁথা। নকশি কাঁথা শত শত বছরের পুরনো বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটা অংশ। [১][২][৩] নকশি কাঁথা বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটা অংশ। সাধারণত পুরাতন কাপড়ের পাড় থেকে সুতা তুলে অথবা তাঁতীদের থেকে নীল, লাল, হলুদ প্রভৃতি সুতা কিনে এনে কাপড় সেলাই করা হয়। [৪] ঘরের মেঝেতে পা ফেলে পায়ের আঙ্গুলের সঙ্গে কাপড়ের পাড় আটকিয়ে সূতা খোলা হয়। এই সূতা পরবর্তীতে ব্যবহারের জন্য রেখে দেয়া হয়। সাধারণ কাঁথা সেলাইয়ের পর এর উপর মনের মাধুরী মিশিয়ে ফুঁটিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন নঁকশা যার মধ্যে থাকে ফুল, লতা, পাতা ইত্যাদি। পুরো বাংলাদেশেই নকশি কাঁথা তৈরি হয়, তবে ময়মনসিংহ, রাজশাহী, ফরিদপুর ও যশোর নকশি কাঁথার জন্য বিখ্যাত।
নকশি কাঁথা শব্দের উৎস

কাঁথা শব্দটির কোন উৎস স্পষ্টভাবে জানা যায় নি। [৫] সঠিকভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় কাঁথা শব্দটি পূর্বে উচ্চারিত হত "খেতা" বলে।[৬] বাংলায় ধানের ক্ষেতকে অনেক সময় "খেত" বলা হয়। নিয়াজ জামানের মতে, কাঁথা শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃতি শব্দ "কঁথা" হতে। "কঁথা" শব্দটির বাংলা হলো ত্যানা। বা কাপড়ের টুকরা।[৭]
অন্যান্য লোকশিল্পের মতো কাঁথার উপর দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিস, আবহাওয়া, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক প্রভাব আছে।[৮] সম্ভবত প্রথমদিকে কাঁথা ছিল জোড়া তালি দেওয়া কাপড়। পরবর্তীতে এটি থেকেই নকশি কাঁথার আবির্ভাব। [৯]
সাহিত্য
পাঁচশ বছর আগে কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত শ্রী শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত বইয়ে কাঁথার কথা সবার প্রথম পাওয়া যায়। পল্লীকবি জসীম উদ্ দীন একটি বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ নকশি কাঁথার মাঠ[১০]

নির্মাণশৈলী

কাছে থেকে দেখা রাজশাহীর কাঁথা। বাম ও নীচের দিক জুড়ে কাঁথার পাড় দেখা যাচ্ছে। কাঁথার জমিনে সাধারণ কাঁথা ফোঁড়ে সাদা সুতা দিয়ে তরঙ্গ আকারে সেলাই দেয়া হয়েছে।
গ্রামাঞ্চলের নারীরা পাতলা কাপড়, প্রধানত পুরানো কাপড় স্তরে স্তরে সজ্জিত করে সেলাই করে কাঁথা তৈরি করে থাকেন। কাঁথা মিতব্যয়ীতার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, এখানে একাধিক পুরানো জিনিস একত্রিত করে নতুন একটি প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করা হয়। কাঁথা তৈরির কাজে পুরানো শাড়ি, লুঙ্গি, ধুতি ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁথার পুরুত্ব কম বা বেশী হয়। পুরুত্ব অনুসারে তিন থেকে সাতটি শাড়ি স্তরে স্তরে সাজিয়ে নিয়ে স্তরগুলোকে সেলাইয়ের মাধ্যমে জুড়ে দিয়ে কাঁথা তৈরি করা হয়। সাধারণ বা কাঁথাফোঁড়ে তরঙ্গ আকারে সেলাই দিয়ে শাড়ীর স্তরগুলোকে জুড়ে দেয়া হয়। বিভিন্ন রঙের পুরানো কাপড় স্তরীভূত করা থাকে বলে কাঁথাগুলো দেখতে বাহারী রঙের হয়। সাধারণত শাড়ীর রঙ্গীন পাড় থেকে তোলা সুতা দিয়ে কাঁথা সেলাই করা হয় এবং শাড়ীর পাড়ের অনুকরণে কাঁথাতে নকশা করা হয়। তবে কোন কোন অঞ্চলে (প্রধানত রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায়) কাপড় বোনার সুতা দিয়েও কাঁথাতে নকশা করা হয়ে থাকে[১১]। সাধারণ কাঁথা কয়েক পাল্লা কাপড় কাঁথাফোঁড়ে সেলাই করা হলেও এই ফোঁড় দেয়ার নৈপুণ্যের গুণে এতেই বিচিত্র বর্ণের নকশা, বর্ণিল তরঙ্গ ও বয়নভঙ্গির প্রকাশ ঘটে। নকশার সাথে মানানোর জন্য বা নতুন নকশার জন্য কাঁথার ফোঁড় ছোট বা বড় করা হয় অর্থাৎ ফোঁড়ের দৈর্ঘ্য ছোট-বড় করে বৈচিত্র্য আনা হয়। উনিশ শতকের কিছু কাঁথায় কাঁথাফোঁড়ের উদ্ভাবনী প্রয়োগকে কুশলতার সাথে ব্যবহার করার ফলে উজ্জ্বল চিত্রযুক্ত নকশা দেখা যায়[১২]। কাঁথাফোঁড়ের বৈচিত্র্য আছে এবং সেই অনুযায়ী এর দুটি নাম আছেঃ পাটি বা চাটাই ফোঁড় এবং কাইত্যা ফোঁড়[১৩]
বেশিরভাগ গ্রামের নারী এই শিল্পে দক্ষ। সাধারণত গ্রামের মহিলারা তাদের অবসর সময় নকশি কাঁথা সেলাই করে থাকেন। এক একটি কাঁথা সেলাই করতে অনেক সময়, এমনকি ১ বছর সময়ও লেগে যায়। নতুন জামাইকে বা নাদ বউকে উপহার দেয়ার জন্য নানী-দাদীরা নকশি কাঁথা সেলাই করে থাকেন। এক একটি কাঁথা সেলাইয়ের পিছনে অনেক হাসি-কান্নার কাহিনী থাকে। বিকেল বেলা বা রাতের খাবারের পর মহিলারা একসাথে বসে গল্প করতে করতে এক একটি কাঁথা সেলাই করেন। তাই বলা হয় নকশি কাঁথা এক একজনের মনের কথা বলে। এটি মূলত বর্ষাকালে সেলাই করা হয়। একটা প্রমাণ মাপের কাঁথা তৈরিতে ৫ থেকে ৭ টা শাড়ী দরকার হয়। আজকাল পুরাতন সামগ্রীর বদলে সূতির কাপর ব্যবহার করা হয়। ইদানীং কাঁথা তৈরিতে পুরাতন কাপড়ের ব্যবহার কমে গেছে।
মূলত নকশা করার পূর্বে কোন কিছু দিয়ে এঁকে নেওয়া হয়। তারপর সুঁই-সুতা দিয়ে ওই আঁকা বরাবর সেলাই করা হয়। কাঁথায় সাধারণত মধ্যের অংশের নকশা আগে করা হয় এবং ধীরে ধীরে চারপাশের নকশা করা হয়। আগে কিছু কাঁথার নকশা আঁকানোর জন্য কাঠের ব্লক ব্যবহার করা হত, এখন ট্রেসিং পেপার ব্যবহার করা হয়।

ধরন

নকশি কাঁথা সেলাইয়ের কোনো নির্দিষ্ট নকশা নেই। যিনি সেলাই করেন তাঁর মনে যা আসে তা-ই তিনি সেলাই করে যান। বলা যায় এটি হচ্ছে মনের ডাইরি। সূর্য, চাঁদ, গাছ, পাখি, মাছ, ফল, মানুষ, ময়ূরসহ বিভিন্ন নকশা করা হয় নকশি কাঁথায়। তবে সেলাইয়ের ধরন অনুযায়ী কাঁথাগুলো নিম্নলিখিত প্রকারে ভাগ করা হয়েছে[১৪]:

চলমান সেলাই

চলমান সেলাই কাঁথাই হলো মূল দেশীয় কাঁথা। এটিকে আবার নকশি ও পাড়তোলা দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

লহরী কাঁথা

পারস্য শব্দ লহর থেকে লহরী কাঁথা নামের উদ্ভব। লহর মানে হলো ঢেউ। সাধারণত রাজশাহীতে এই কাঁথা বিখ্যাত। এই কাঁথা আবার সোজা, কেউটের খুপি, বরফি অথবা তারা (চারচালা, আটচালা অথবা বড়চালা) ইত্যাদিতে বিভক্ত।

আনারসি

আনরসি কাঁথা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও যশোরে পাওয়া যায়। আনারস টান, আনারস টাইল, আনারস ঝুমকা ও আনারস লহরী এর বিভিন্ন প্রকারভেদ।

বাঁকা সেলাই

এই কাঁথা সবার প্রথম তৈরি হয় ব্রিটিশ আমলে।[১৫] সাধারণত এই কাঁথা বাঁকা সেলাইয়ের মাধ্যমে তৈরি হয়।

সুজনি কাঁথা

এটি শুধু রাজশাহী এলাকায় পাওয়া যায়। সাধারণত এই কাঁথায় ঢেউ খেলানো ফুল ও লতাপাতার নকশা থাকে।

সেলাই

প্রথম দিকে শুধু চলমান সেলাই কাঁথা প্রচলিত ছিল। এই ধরণের শিলাইকে ফোড় বলা হয়। [১৬] বর্তমানে চাটাই সেলাই, কাইত্যা সেলাই, যশুরে সেলাই, রিফু সেলাই, কাশ্মীরি সেলাই, শর সেলাই, ইত্যাদি সেলাই দিয়ে কাঁথা তৈরি হয়। মাঝে মধ্যে হেরিংবোন সেলাই, সাটিন সেলাই, ব্যাক সেলাই ও ক্রস সেলাই ব্যবহার করা হয়।[১৭]

ধরন

কাঁথা সাধারণত লেপের মতো মুড়ি দিয়ে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধরণের কাঁথা গুলো হলোঃ[১৮]
  • লেপ-কাঁথা - আকারে বড় ও মোটা হয়।
  • শুজনি কাঁথা - লেপ কাঁথার মত বড় আকারের, তবে এই কাঁথা পাতলা হয়।
  • রূমাল কাঁথা - সাধারণত এক বর্গফুট আকারের কাঁথা।
  • আসন কাঁথা - বসার কাজে ব্যবহৃত হয়।
  • বস্তানি বা গাত্রি - ভারী ও মূল্যবান জিনিসপত্র এবং কাপড় চোপড় ঢেকে রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়।
  • আর্শিলতা - আর্শি (আরশি) বা আয়না, চিরুনি ইত্যাদি ঢেকে রাখার কাজে ব্যবহার হয়।
  • দস্তরখান - খাবার সময় মেঝেতে পেতে তার উপরে খাবার দাবার ও বাসনপত্র রাখা হয়।
  • গিলাফ - খাম আকারের এই কাঁথার মধ্যে কোরআন শরীফ রাখা হয়।

নকশা

নকশি কাঁথার নকশাগুলোতে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে। যদিও কোন নির্দিষ্ট নিয়ম মানা হয় না, তবে ধরে নেওয়া হয় প্রত্যেকটা ভালো সেলাইকৃত নকশি কাঁথার একটি কেন্দ্র থাকবে। বেশিরভাগ কাঁথার কেন্দ্র হলো পদ্ম ফুল এবং পদ্ম ফুলের আশে পাশে নানা রকম আঁকাবাঁকা লতার নকশা থাকে। কখনো শাড়ীর পাড় দিয়ে সীমানা তৈরি করা হয়। নকশাতে ফুল, পাতা, পাখি মাছ, প্রাণী, রান্না আসবাব, এমনকি টয়লেট সামগ্রীও থাকতে পারে। বেশীর ভাগ কাঁথার প্রাথমিক কিছু নকশা একই রকম হলেও দুইটি কাঁথা একই রকম হয় না। সাধারণত কাঁথাতে একই নকশা বারবার ব্যবহৃত হয়। উল্লেখযোগ্য নকশাগুলো হলোঃ

পদ্ম নকশা

পদ্ম নকশা
পদ্ম নকশা নকশি কাঁথাগুলোতে সবচেয়ে বেশী পাওয়া যায়। পদ্ম ফুল হিন্দুধর্মের দেবদেবীর সাথে যুক্ত, এই জন্যও এটি বেশ জনপ্রিয়। পদ্মফুল হলো স্বর্গীয় আসন। এটা অবশ্য মহাজাগতিক মিলন ও নারীর প্রয়োজনীয়তাকেও বোঝায়। পদ্ম শাশ্বত আদেশ এবং আকাশ, মাটি ও পানির ঐক্য হিসেবেও মূর্ত। এটি জলের জীবনদায়ক ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে এবং এছাড়াও পাপড়ির খোলা ও বন্ধ করা অবস্থাকে সূর্যের সাথে তুলনা করা হয়। এটি পবিত্রতার প্রতীক। এটি ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক। অষ্টদল থেকে শুরু করে শতদল বিভিন্ন ধরণের পদ্ম নকশা রয়েছে। পুরাতন প্রায় প্রত্যেকটা কাঁথাতে মাঝখানে একটি ফুটন্ত পদ্ম দেখতে পাওয়া যেত।

সূর্য নকশা

এই নকশা পদ্ম নকশার কাছাকাছি নকশা। কখনো কখনো এই দুই নকশা কাঁথার কেন্দ্রে একসাথে দেখা যায়। এটি সূর্যের জীবনদায়ক ক্ষমতার প্রকাশ করে। সূর্য হিন্দুদের ধর্মীয় ও বিবাহ উভয় আচারেই গুরত্ব বহন করে।

চন্দ্র নকশা

চন্দ্র নকশা মুসলমান ধর্মীয় প্রভাব রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় নক্ষত্র সহযোগে একটি অর্ধচন্দ্রাকার নকশা। এই নকশা মূলত জায়নামাজ কাঁথায় দেখতে পাওয়া যায়।

চাকা নকশা

সাধারণত চাকা নকশা হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয়েরই ভারতীয় কলার প্রতীক। এটি আদেশের প্রতীক। এটি অবশ্য বিশ্বকেও প্রতিনিধিত্ব করে। যদিও বেশীর ভাগ কাঁথা নির্মাতা চাকার গুরুত্ব জানেনা, তবুও এটি বেশ জনপ্রিয়। এটি চাটাই ফোর এর তুলনায় সহজ। পূর্বে এটি বর্ক রেখা বেষ্টিত হলেও বর্তমানে এটি

স্বস্তিকা নকশা

প্রাণী, মাছ, প্রজাপতি, বৃক্ষ ও মানুষের নকশা অঙ্কিত সমসাময়িক নকশি কাঁথা(দেয়ালিকা হিসেবে ব্যবহৃত)
সংস্কৃতিতে সু অস্তি মানে হলো এটি ভাল। এই নকশা সিন্ধু সভ্যতার সমসাময়িক। এটি ভালো ভাগ্যের প্রতীক। এটি মিছরি অথবা গোলক ধাঁধা হিসেবেও পরিচিত। সময়ের সাথে, মহেঞ্জোদাড়ো আমলের সোজা রেখা সম্বলিত স্বস্তিকার চেয়ে বক্ররেখা বেষ্টিত স্বস্তিকা এখন বেশি ব্যবহৃত হয়। হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন প্রত্যেকটা ধর্মে এই প্রতীকের গুরুত্ব রয়েছে।

জীবনবৃক্ষ নকশা

কালকা নকশা নিকট দৃশ্য
সিন্ধু সভত্যার সময় থেকে ভারতের শিল্প-সংস্কৃতিতে এই নকশার প্রভাব রয়েছে। মনে হয় যে, সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা পিপুল গাছকে জীবনবৃক্ষ হিসেবে ধারণা করত... এর মধ্যে দিয়ে দেবতা তার সৃষ্টির শক্তি প্রকাশ করছে।[১৯] বৌদ্ধ আমলেও এই বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। পিপল বৌদ্ধদের নিকট পবিত্র বৃক্ষ, কেননা বুদ্ধ এই গাছের ছায়াই বসেই বোধিপ্রাপ্ত হন। এটি প্রকৃতির সৃষ্টির ক্ষমতা প্রতিফলিত করে এবং বাংলাদেশে অনেক জনপ্রিয়। আঙ্গুরগাছ ও লতাপাতার কাঁথার নকশায় যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে এবং এতে জীবন বৃক্ষের মতো একই রকম প্রতীক বহন করে। পান পাতার লহরি রাজশাহীতে অনেক জনপ্রিয়।

কালকা নকশা


মুঘল আমল থেকে আজ পর্যন্ত এই নকশা ব্যবহার করা হয়।[২০] কালকা নকশার উৎপত্তি পারস্যে ও কাশ্মীর এবং এটি বর্তমানে উপমহাদেশের অবিচ্ছেদ্য নকশা।[২১]

0 comments:

Post a Comment